দোকানে ঠাকুর দেবতার ছবি থাকলে “দোকানের খাবার ও মিষ্টি হালাল হবে না” বলে পিটিয়ে খুন মিষ্টি ব্যবসায়ীকে। খুনী একই পরিবারের উগ্র ইসলামপন্থী বাবা-মা-ছেলে। গাজীপুরের কালীগঞ্জে পরিকল্পিতভাবে তুচ্ছ ঘটনাকে ইস্যু করে হিন্দু এক মিষ্টি ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীরা সবাই একই পরিবারের বাবা-মা ও ছেলে। নিহত ব্যবসায়ীর নাম লিটন চন্দ্র ঘোষ (৫৫)। স্থানীয়ভাবে ‘কালী ময়রা’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি কালীগঞ্জ পৌরসভা সংলগ্ন বড়নগর সড়কে অবস্থিত বৈশাখী সুইটমিট অ্যান্ড হোটেলের মালিক।প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়,গতকাল শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সকাল ১১টার দিকে দোকানের এক কিশোর হিন্দু কর্মীকে মারধর করার সময় তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে কালী ময়রা নিজেই হামলার শিকার হন এবং ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, ওই সময় মাসুম মিয়া (২৮) নামের এক উগ্র ইসলামপন্থী যুবক বৈশাখী সুইটমিট অ্যান্ড হোটেলে যায়। ওই দোকানের মালিক হিন্দু হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে দোকানে ঠাকুর দেবতার ছবি রাখা ছিলো। মাসুম মিয়া দোকানের কর্মচারী অনন্ত দাশকে (১৭) ডেকে বলে, “এই দোকানে কোনো ঠাকুর দেবতার ছবি রাখা যাবে না। তাহলে দোকানের মিষ্টি ও অন্যান্য খাবার হারাম হয়ে যাবে। মুসলমানের দেশে হারাম খাবার বিক্রি করা যাবে না।”দোকানের হিন্দু কর্মচারি অনন্ত এই কথার প্রতিবাদ জানালে মাসুম তার সাথে কথাকাটাকাটি শুরু করে। একপর্যায়ে মাসুম মিয়া দোকানকর্মী অনন্ত দাশকে বলে, “তুই ব্যাটা হিন্দু, তোর মালিকও হিন্দু। মুসলমানের দেশে থেকে দোকানে ঠাকুর দেবতার ছবি রাখিস, আবার মুসলমানের সাথেই মুখে মুখে তর্ক করার সাহস তোর হয় কী করে? হিন্দু হওয়ার সাধ মিটিয়ে দিচ্ছি তোকে।” এই বলেই অনন্তকে এলোপাথারি মারতে শুরু করে মাসুম মিয়া। মারধর শুরু করার প্রায় সাথে সাথেই মাসুমের বাবা স্বপন মিয়া (৫৫) ও মা মাজেদা খাতুন (৪৫) ঘটনাস্থলে এসে ছেলের সাথে মিলে দোকানকর্মী অনন্ত দাশকে মারধর করতে শুরু করে। তখন দোকান মালিক কালী ময়রা পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং তার কর্মীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তাকেও বেধড়ক মারধর শুরু করে ওই তিনজন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একপর্যায়ে বেলচা দিয়ে কালী ঘোষের মাথায় আঘাত করে তারা। সাথে সাথেই তিনি ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি আর উঠে দাঁড়াতে পারেনন। তাৎক্ষণিকভাবে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।ঘটনার পরপরই স্থানীয় জনতা হামলাকারী তিনজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। আটক ব্যক্তিরা হলেন— মোহাম্মদ স্বপন মিয়া (৫৫), মাজেদা খাতুন (৪৫) এবং মাসুম মিয়া (২৮)। তাদের বাড়ি কালীগঞ্জ উপজেলার বালীগাঁও এলাকায়।এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় গভীর শোক ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন সাংবাদিকদের জানান, “ঘটনার পরপরই জড়িত তিনজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। নিহতের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।”সাম্প্রদায়িক ইস্যু তুলে প্রকাশ্যে একজন হিন্দু ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আবারও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারটির দাবি, পূর্ববিদ্বেষ থেকেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, মাসুমদের পুরো পরিবারটি উগ্র ইসলামী মতাদর্শে বিশ্বাসী। তারা এর আগেও একাধিক হিন্দু পরিবারের সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে ঝামেলার সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িক উস্কানী তৈরি করেছে।